রাজনীতি

লংমার্চের সাফল্যে আত্মবিশ্বাসী ১১ দল, সামনে আরও কর্মসূচি

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:২২

ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেছে ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্য/ছবি: জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেজ

রাজপথের কর্মসূচি, সংসদের ভেতরে বিতর্ক-বক্তব্য আর সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনার পর এবার দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে জনগণের আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্য। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চের মধ্যদিয়ে জোটের নেতারা একদিকে নিজেদের দাবিগুলো তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছেন।

 

গত ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হওয়া গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-সার সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই লংমার্চের আয়োজন করে বিরোধী এই জোট।

 

জোটের নেতাদের দাবি, এই কর্মসূচির মধ্যদিয়ে তারা পেয়েছেন জনগণের সাড়া, রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান জানানোর সুযোগ এবং সরকারকে চাপের রাখার কৌশল।

 

মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের সমাপনী সমাবেশের মধ্যদিয়ে শেষ হওয়া এই কর্মসূচিকে জোটের নেতারা ‘সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এছাড়া টানা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখাও অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন অনেকে।

লংমার্চে যেসব স্থানে সমাবেশ

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মতিঝিলে উপস্থিতি ও সূচনা সভার মধ্যদিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জের মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে প্রথম পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় পথসভা হয় কুমিল্লার পদুয়া বাজারে। তৃতীয় পথসভা অনুষ্ঠিত হয় ফেনীর মহিপালে এবং চতুর্থ পথসভা হয় চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে। সবশেষে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্যদিয়ে ওই দিনের লংমার্চ কর্মসূচি শেষ হয়।

আরও যেসব বিভাগে লংমার্চ

জোটের নেতা জানিয়েছেন, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সবশেষ সিলেট বিভাগে লংমার্চ করবে দলগুলো। এর মধ্যদিয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে দাবি না মানলে কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতিও নেওয়া হবে বলে জানান তারা।

যেসব দাবিতে লংমার্চ

১১ দলীয় ঐক্য জোটের দাবিগুলো হলো—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস-সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।

 

লংমার্চের অর্জন নিয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘লংমার্চ থেকে অর্জন হচ্ছে জনসম্পৃক্ততা। মানুষের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকশন। বিরোধীদলের রাজনীতির একটা জায়গাই থাকে, তা হচ্ছে জনগণের ভয়েস হয়ে ওঠা। মানুষ তো সমস্যাগুলোর মধ্যদিয়ে যাচ্ছে।’

৫ সেপ্টেম্বর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয় ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ

তিনি বলেন, ‘আমাদের ছয় দফা দাবি ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি থেকে শুরু করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট—এই সংকটগুলোর কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। এখন সংসদে আমাদের যতটুকু সুযোগ হয়, আমাদের এমপিরা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর তো সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।’

এনসিপির এই নেত্রী বলেন, ‘যে সংকটের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ যাচ্ছে এবং জনগণ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, এই জায়গাটাতে আমাদের পক্ষ থেকে জনগণের সঙ্গে সেই কমিউনিকেশনটা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

মনিরা শারমিন বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে এই মেসেজটা দেওয়া যে এই সংকটগুলো নিরসনে অবশ্যই সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার এবং তাদের আসলে পরিকল্পনা কী, এই ব্যাপারগুলো জনগণের সঙ্গে উন্মুক্ত করা দরকার, মানুষকে জানানো দরকার। কারণ মানুষ আসলে কোনো সদুত্তর পাচ্ছে না।’

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা বলেন, ‘সরকারের যদি জবাবদিহি নিশ্চিত না করা যায়, তো সেই সরকারটা আবার সেই হাসিনা আমলের দিকে ফিরে যাবে। সরকারের এই জায়গাগুলোতে পরিষ্কার করা উচিত, স্পষ্ট করা উচিত যে তারা পদক্ষেপগুলো কী নিচ্ছে। এই সংকটগুলো এভাবে জিইয়ে রেখে, দেখেও না দেখার ভান করা বা জনবিচ্ছিন্ন যে রাজনীতি আমরা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে দেখেছি, সরকারগুলো ক্ষমতায় এলে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তো সেই জায়গা থেকে একটা বার্তা দেওয়া যে আমরা জনগণের সঙ্গে আছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোকে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন দেখেছি যে বিরোধীদল একটা অকর্মণ্য পরিস্থিতি এবং বিরোধীদল যে আসলে আছে, সরকারের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো ছাড়া আসলে বিরোধিতার আর কোনো কাজ ছিল না। বিএনপিকেও কিন্তু আমরা আওয়ামী লীগের সময় শক্তিশালী বিরোধীদল হিসেবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছি।’

লংমার্চের সমাবেশে জামায়াত আমিরসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা

 

‘তো সেই জায়গা থেকে সরকার জনগণকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, তার জীবনযাপন, স্বাভাবিক জীবনযাপন যখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তখন সরকারের যে ভুল পদক্ষেপগুলো বা মিসম্যানেজমেন্টগুলো, এগুলোর ব্যাপারে জনগণের ভয়েস হয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে বিরোধীদল, এটাই গণতান্ত্রিক দেশের নিয়ম। সেই জায়গাটাই আসলে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যে সাধারণ জনগণের সঙ্গে যেই কানেকশন।’

তিনি বলেন, ‘১১টি দল একসঙ্গে মুভ করছে, দলের নেতাকর্মীরা সম্পৃক্ত হচ্ছে, এছাড়াও অদ্ভুতভাবে যেটা আমি ব্যক্তিগতভাবে খেয়াল করেছি যে, একেবারে সাধারণ মানুষ যারা কোনো দলই হয়তো করেন না, কিন্তু তারাও রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেছেন আমাদের একটু দেখার জন্য বা আমরা কী বলি পথসভাগুলোতে সেটা শোনার জন্য। সাধারণ মানুষ কানেক্ট করছেন এই কর্মসূচিটা, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।’

দেশের জন্য, জনগণের জন্য, দেশের মানুষের জন্য আমাদের এই আন্দোলন। এই আন্দোলন অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক এবং নন-ভায়োলেন্ট আন্দোলন আমরা করেছি, যেন জনগণের সম্পৃক্ততা দিন দিন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।- এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াতে ইসলামী

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবি ছিল। এসব দাবি নিয়ে আমরা সংসদে কথা বলছি, রাজপথে আমাদের কর্মসূচি ছিল। ওই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই আমরা সর্বশেষ যে কর্মসূচিগুলো দিয়েছিলাম, এর মধ্যে এটা ছিল যে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ, যেটা আরও কয়েকটি জায়গায় হবে। রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সর্বশেষ সিলেটে হবে।’

 

তিনি বলেন, ‘এই কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা জনগণকে বার্তা দিয়েছি যে জনগণের যে দাবি, জনগণের যে ভোগান্তি, জনগণের ওপর যে দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন চাপ, আমরা সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছি জনগণের পক্ষ থেকে এটার সমাধান হওয়া উচিত।’

এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘রাষ্ট্রের সংস্কার বা আমাদের প্রশাসনিক যে সংস্কারগুলো, সাংবিধানিক যে সংস্কারগুলো জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা সরকার পূরণ না করে ভিন্নপথে হাঁটছে। সরকার দলীয়করণের দিকে হাঁটছে, তারপর দলীয় নেতাকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্বে বসাচ্ছেন, যেখানে দুর্নীতিবাজ বা স্বজনপ্রীতির প্রচুর সুযোগ রয়ে গেছে। জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রের সংস্কার না হওয়ার কারণে আবার যে ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, আমরা এই মেসেজ জনগণকে দিয়েছি।’

জোটের নেতা জানিয়েছেন, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সবশেষ সিলেট বিভাগে লংমার্চ করবে দলগুলো

এই জামায়াত নেতা বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা দেখেছি যে সকাল ৭টা থেকে আরম্ভ হয়েছে আমাদের লংমার্চ, আর রাত ৯টায় শেষ হয়েছে চট্টগ্রামের লালদীঘির ময়দানে গিয়ে। প্রতিটি পর্বেই বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল, স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল এবং সীমাহীন ধৈর্য এবং সব ধরনের ত্যাগ এবং তিতিক্ষা নিয়েই মানুষ আলহামদুলিল্লাহ পুরো দিনব্যাপী প্রতিটি পথে, প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি রাস্তায় আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হয় যে এই দাবি আসলে জনগণের দাবি এবং এই দাবি সরকারকে অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।’

এই লংমার্চের মাধ্যমে বিরোধীদল হিসেবে সরকারকে রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করলেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘এটা ছিল জনগণের পক্ষ থেকে দাবি আদায়ের জন্য সরকারের ওপর গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় চাপ প্রয়োগ করা। এটাই রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। যেহেতু সমস্যার সমাধান সরকার করছে না, জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবনা, ভোটের রায়টা কার্যকর করছে না, এজন্য বাধ্য হয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই রাজপথে আমাদের আন্দোলনটা করতে হচ্ছে।

‘দেশের জন্য, জনগণের জন্য, দেশের মানুষের জন্য আমাদের এই আন্দোলন। এই আন্দোলন অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক এবং নন-ভায়োলেন্ট আন্দোলন আমরা করেছি, যেন জনগণের সম্পৃক্ততা দিন দিন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।’ যোগ করেন তিনি।

চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্যদিয়ে লংমার্চ শেষ হয়

বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান ইরান জাগো নিউজকে বলেন, ‘লংমার্চ আমাদের তৃতীয় ধাপের একটা কর্মসূচি। হঠাৎ করে আমাদের এই লংমার্চটা হয়নি। আমরা প্রথমেই বলেছি যে, এটা সরকারের পতনের আন্দোলন না। এটা হচ্ছে সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মিনিটের মাথায় জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে, জাতির সঙ্গে বেইমানি করেছে। জনগণের যে রায়, ৭০ ভাগ রায় হচ্ছে গণভোটের পক্ষে। সেই গণভোটের রায়কে তারা অস্বীকার করেছে, তারা এটাকে অবজ্ঞা করেছে।’

 

‘তো সে কারণে আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য, আইনশৃঙ্খলা উন্নতির জন্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবিতে এবং সরকার যে দলীয়করণ করেছে—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হচ্ছে গিয়ে একটা সোয়েটার কোম্পানির মালিক এবং ঋণখেলাপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যিনি ভিসি, তিনি  বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। তো এভাবে দলবাজদের বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে তারা যে কাজগুলো করেছে, এটা আমরা জনগণকে জানিয়েছি।’ বলেন মুস্তাফিজুর রহমান ইরান।

তিনি বলেন, ‘জনগণকে সচেতন করার জন্য আমাদের কাজ আমরা করছি। আমরা মনে করি আমাদের যেই উদ্যোগ, আমাদের যেই প্রচেষ্টা, আমরা শতভাগ সফল হয়েছি। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ছিল।’

 

বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি আরও বলেন, ‘রাস্তার দুইধারে যেভাবে মানুষের উচ্ছ্বাস এবং যেভাবে আবেগ নিয়ে আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন, এক একটা পথসভা ছিল জনসমুদ্র। মনে হয় যেন পল্টন ময়দানের চেয়েও অনেক লোকের বেশি সমাগম একেকটা পথসভায়।  আমরা মনে করি, সরকার আমাদের এই জনস্রোতে ভীত হয়েছে।’

 

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন


বিজ্ঞাপন